
◾চরফ্যাসন (ভোলা) প্রতিনিধিঃ
ভোলার চরফ্যাসনে লাগামহীন বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও নদী-সমুদ্রে ইলিশের সংকটে বরফ উৎপাদন না হওয়ায় বন্ধের পথে ৩২ বরফ কল। দিনে-রাতে সমানতালে বিদ্যুৎ বিভ্রাটে সাধারণ গ্রাহকের ভোগান্তির পাশাপাশি বরফকলসহ কারখানায় উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হওয়ার ফলে ইতিমধ্যে ২০টি বরফকল বন্ধ হয়ে গেছে। অপর বাকী ১৫টি সীমিত পরিসরে চলছে ও লোকশানের মুখে পড়েছে বরফকল মালিকরা। ইলিশের অকাল ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারনে বরফ উৎপাদন বন্ধ থাকায় বেকার হয়ে পড়েছেন বরফ কলসহ ছোট-বড় কারখানার কয়েকশ শ্রমিক। বরফ উৎপাদন না থাকায় উপকূলের মাছঘাটগুলোতে পচে যাচ্ছে লাখ লাখ টাকার মাছ। চলতি মৌসুমে বরফকল, আড়ত ও ট্রলার মালিক ছাড়াও এ পেশায় সংশ্লিষ্টদের প্রায় ২০ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। একই কারণে দুটি অটো রাইস মিলসহ ছোট-বড় অর্ধশত কারখানাও বন্ধ রয়েছে।
বাসাবাড়ির বৈদ্যুতিক পাখা, ফ্রিজসহ ইলেকট্রনিকস সামগ্রী অকেজো হয়ে পড়ছে। পৌরসভাসহ উপজেলার লক্ষাধিক গ্রাহক বিদুৎ নিয়ে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়ে আছে। বরফ উৎপাদন বন্ধ হওয়ার ফলে মৎস্য খাতে বিরূপ প্রভাবের পড়ছে। পাশাপাশি চরম বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে হাসপাতালে রোগীর কষ্ট বেড়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, কোরবানী ঈদের আগে থেকেই ভোলার ৩৪ মেঃ রেন্টালের দুইটি ট্রান্সফরামার মধ্যে একটি বিকল হয়ে পড়ে আছে।
ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার রেন্টালের একটি ট্রান্সফরমা বিকলের কারনে ভোলায় ১০ মেঘাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। সচল ১৪ মেঘাওয়াট ট্রান্সফরমা দিয়ে জেলায় বিদ্যুৎ প্রবাহ সহনীয় পর্যায় রাখতে একটি ট্রান্সফরমা দিয়ে ৩৩ কেভি ফিডার লাইনের মাধ্যমে সীমিত আকারে ৬ উপজেলায় বিদ্যুৎসরবরাহ অব্যহত রাখা হয়। বিকল ট্রান্সফরমা সংস্কার হলে হয়তো বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধান হবে।
বরফ কল মালিক সমিতির সভাপতি বাবুল মিয়া জানান, চলতি ইলিশের মৌসুমে বিদ্যুতের তীব্র সংকট পাশাপাশি নদ-নদীতে ইলিশেরও সংকট থাকার কারনে চাহিদা তুলনায় বরফ উৎপাদন ও বিক্রি করতে না পেরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বরফ কলগুলো। বিদ্যুতের লোডশেডিং এর কারনে বরফের চাহিদা থাকলেও উৎপাদন করা যাচ্ছে না।
তাই গত দুই তিন মাস ধরে লোকশানের মুখে পড়েছেন বরফ কল মালিকরা। সিমিত পরিসরে বিদুৎ পেলেও ইলিশ সংকটের কারনে সামান্য পরিমানে বরফ উৎপাদন হলেও লোকশানে পড়তে হয় বরফকল মালিকদের। এতে চরফ্যাসন উপজেলার ৩৫ টি বরফ কলে ইলিশের চলতি মৌসুমে প্রায় ২০ কোটি টাকা লোকশানে আছেন। বেকার হয়ে পড়েছে বরফ কলের প্রায় ৬০০ শ্রমিক। উৎপাদন নেই কিন্তু অলস বসে থাকা শ্রমিকদের বেতন দিতে হচ্ছে মালিকদের । এতে আরো বিপাকে পরেছেন মালিকরা। এখনও ইলিশ শিকারের আরো তিন মাস মৌসুম রয়েছে। এর মধ্যে নদীতে পর্যাপ্ত ইলিশ ও বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান হলে লোকশান পুষিয়ে নেয়ার আশা করা যায়।
নতুন স্লুলিজঘাটের মৎস্য ব্যবসায়ী রফিক মিয়া ও হাবিব উল্লাহ জানান, ভরা মৌসুমে ইলিশ সংকটের কারনে দ্বিগুন দামে মাছ কিনে জেলার বাহিরে তারা চালান করে থাকেন। পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংকটের কারনে বরফ কল বন্ধ থাকায় সঠিক সময়ে মিলছেনা বরফ। সিমিত পরিসরে বফর পেলেও ঢাকার মোকামে মাছ চালন করতে গিয়ে ট্রলারেই পচে যাচ্ছে মাছ। এতে চাড়া দামে মাছ কিনে বরফ সংকটের কারনে লোকশানে পরতে হচ্ছে তাদের। মাছ পচে যাওয়ার করনে প্রতি ট্রিপে ১০/১৫ হাজার টাকা লোকশান দিতে হচ্ছে তাদের।
সামরাজ আড়ত মালিক সমিতির সভাপতি আজিজ পাটোয়ারী জানান, বিদ্যুৎ বিভ্রাট অন্যদিকে বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বরফ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে মাছ সংরক্ষণ নিয়ে বিপদে পড়েছেন তারা। বরফ সংকটের কারণে মাছ মোকামে চালান করতে সমস্যা হচ্ছে। আড়তেই পচে যাচ্ছে লাখ লাখ টাকার মাছ। গত কয়েক দিন দুই কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে তাদের।
বরফকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সেলিম মিয়া জানান, ৫৮ দিন ইলিশ শিকারে নিষেধাজ্ঞা চলাকালে বরফ উৎপাদন বন্ধ ছিল। এখন বরফকল সচল হলেও দেখা দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভ্রাট। এরই মধ্যে ২০টি বরফকল বন্ধ হয়ে গেছে।
একই অভিযোগ ট্রলার মালিক ছালাউদ্দিনের। তাঁর ভাষ্য, বিদ্যুৎ বিভ্রাটে বরফ উৎপাদন বন্ধ। ট্রলারে মাছ সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত বরফ না থাকায় সাগরে যেতে পারছে না জেলেরা। এতে বেকার হয়ে পড়েছেন লক্ষাধিক জেলে। আর ভরা মৌসুমে লোকসানের মুখে পড়েছেন ট্রলার মালিকরা।
অটো রাইস মিল মালিক কামাল গোলদার জানান, লাগামহীন লোডশেডিংয়ে অনেক রাইস মিল বন্ধ হয়ে গেছে। উৎপাদন বন্ধ থাকায় বেকার হয়ে পড়েছেন শ্রমিকরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট কয়েকজন জানান, চরফ্যাসন সাব-স্টেশনের ধারণক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির (পবিস) টানাপোড়েন এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইনে কারিগরি ত্রুটির কারণে বিদ্যুতের এ সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। শীত মৌসুমের আগে চলমান এ বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার সম্ভাবনা নেই বলে জানান তারা।
ওজোপাডিকোর চরফ্যাসন আবাসিক প্রকৌশলী মিজানুর রহমান জানান, ভোলার বোরহানউদ্দিনের ৩৩ কেভি রেন্টালের দুটি ট্রান্সফরমার একটি বিকল। এ কারণে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে না। দিনে-রাতে এক থেকে দেড় ঘণ্টা করে লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির (পবিস) জিএম সুজিত কুমার বিশ্বাস জানান, ভোলার বোরহানউদ্দিনের দুটি রেন্টাল প্লান্টের একটি ট্রান্সফরমার বিকল। দ্রুত সেটি সংস্কারে জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।
