সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা শরিফ ওসমান হাদির (বাঁয়ে) মরদেহ গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে। ছবি : প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং

  • রাষ্ট্রীয় শোক আজ।

  • দুপুর ২টায় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জানাজা।

  • কবি নজরুলের পাশে সমাহিত করা হবে : ইনকিলাব মঞ্চ।

 

জালালাবাদ বার্তা ডেস্কঃ 

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদির মরদেহ সিঙ্গাপুর থেকে দেশে পৌঁছেছে। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা ৫টা ৪৮ মিনিটে হাদির মরদেহ বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইটটি (বিজি-৫৮৫) সিঙ্গাপুর থেকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে বলে জানিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং।

প্রেস উইং জানিয়েছে, আজ শনিবার দুপুর ২টায় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় হাদির জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরিবারের ইচ্ছায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে হাদিকে সমাহিত করা হবে বলে জানিয়েছে ইনকিলাব মঞ্চ।

ইনকিলাব মঞ্চের নেতা নাইম ইবনে জহির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শনিবার বাদ জোহর সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় হাদির জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে তাঁর লাশ দাফন করা হবে।’

এদিকে শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুতে আজ সারা দেশে রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ১১টায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস এ রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেন।

রাষ্ট্রীয় শোক হওয়ায় দেশের সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সব সরকারি-বেসরকারি ভবন এবং বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোতে আজ জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে।

বাংলাদেশ সময় গতকাল দুপুর ২টা ৩ মিনিটে সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করে হাদির মরদেহ বহনকারী বিমানটি। সিঙ্গাপুর থেকে হাদির লাশের সঙ্গে আসেন তাঁর বড় ভাই আবু বকর। বিমানবন্দরে জাতীয় পতাকায় মোড়ানো হাদির কফিন বুঝে নিতে উপস্থিত ছিলেন হাদির বোনজামাই আমিরুল ইসলাম এবং ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের।

শাহজালাল বিমানবন্দরে হাদির কফিন নামানো হলে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় সেখানে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, দৈনিক আমার দেশের সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন ও মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ এবং ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম উপস্থিত ছিলেন।

পরে বিমানবন্দর থেকে হাদির মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের হিমঘরে। গতকাল রাতে তাঁর লাশ সেখানেই রাখা হয়।

এদিকে গতকাল বিমানবন্দর থেকে হাদির কফিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে নেওয়ার কথা থাকলেও তার পরিবর্তে আজ নেওয়া হবে বলে ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

গতকাল হাদির মরদেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে না আনার সিদ্ধান্তে শাহবাগের কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা দেন ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ। গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে দেওয়া ঘোষণায় তিনি বলেন, ‘হাদির মরদেহ হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে রাখা হয়েছে। তাই আমরা আজকের মতো এখানে কর্মসূচি শেষ করছি। আগামীকাল (আজ) দুপুর ২টার দিকে সংসদ ভবনে হাদি ভাইয়ের জানাজা শেষে মিছিল নিয়ে আমরা শাহবাগে এসে অবস্থান নেব। এরপর ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।’

এদিকে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে হাদির লাশ সমাহিত করা হবে বলে গতকাল সন্ধ্যায় ইনকিলাব মঞ্চের এক বার্তায় জানানো হয়েছে। এরপর মিছিলসহ ওসমান হাদির লাশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে আনা হবে। তবে ওসমান হাদির লাশ দেখার কোনো সুযোগ থাকবে না জানিয়ে ইনকিলাব মঞ্চ সবাইকে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং শহীদ ওসমান হাদির জন্য দোয়া করার অনুরোধ জানিয়েছে।

ইনকিলাব মঞ্চের বার্তায় আরো জানানো হয়, ছাত্র-জনতা শৃঙ্খলার সঙ্গে আন্দোলন জারি রাখবেন, যেন কোনো গোষ্ঠী অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে আন্দোলন স্তিমিত করতে না পারে। একই সঙ্গে সহিংসতা করার সুযোগও যেন না পায়।

হাদির জানাজায় ব্যাগ বা ভারী বস্তু বহন না করার অনুরোধ:

আজ দুপুর ২টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শহীদ ওসমান হাদির জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের পক্ষ থেকে শহীদ ওসমান হাদির জানাজায় অংশগ্রহণে আগ্রহীদের কোনো প্রকার ব্যাগ বা ভারী বস্তু বহন না করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে এ সময় সংসদ ভবন ও এর আশপাশের এলাকায় ড্রোন ওড়ানোও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

মসজিদ ও উপাসনালয়ে দোয়া ও প্রার্থনা :

এদিকে ওসমান হাদির আত্মার মাগফেরাত কামনায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমসহ গতকাল দেশের বিভিন্ন মসজিদে জুমার নামাজের মোনাজাতে বিশেষ দোয়া করা হয়েছে। দোয়ায় হাদিকে শহীদ হিসেবে কবুল করা এবং তাঁর জন্য জান্নাতের সুউচ্চ স্থান প্রার্থনা করা হয়। সেই সঙ্গে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনাও প্রকাশ করেন মুসল্লিরা। এ ছাড়া গতকাল দুপুর আড়াইটায় ঝিনাইদহ শহরের পায়রা চত্বরে ওসমান হাদির গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সাবেক শিক্ষার্থী হাদির মাগফিরাত কামনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগে বিশেষ দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল বাদ মাগরিব কেন্দ্রীয় মসজিদ মসজিদুল জামিআসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সব মসজিদে বিশেষ দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান মাগরিবের নামাজ শেষে নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে আয়োজিত দোয়া মাহফিলে অংশ নেন।

বছরজুড়ে আলোচনায় হাদি : শুরু থেকে শেষ:

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদি গুলিবিদ্ধ হয়ে গত বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১০টার দিকে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার পরদিন গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রচারণা চালানোর সময় রাজধানীর পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে মাথায় গুলিবিদ্ধ হন তিনি।

গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাঁকে প্রথমে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং পরে অবস্থার অবনতি হলে বেসরকারি এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকারি উদ্যোগে গত ১৫ ডিসেম্বর তাঁকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুর নেওয়া হয়।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন ঘটনা ও বক্তব্যের কারণে আলোচনায় ছিলেন শরিফ ওসমান হাদি। গত বছরের আগস্টে ইনকিলাব মঞ্চ গঠনের পর থেকেই পরিচিতি পেতে থাকেন তিনি। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও ভারতবিরোধী বক্তব্য এবং টক শোতে সরব উপস্থিতির কারণে ব্যাপক পরিচিতি পান এই যুবক। তাঁর কিছু বক্তব্য নানা আলোচনা-সমালোচনারও জন্ম দেয়।

জুলাই অভ্যুত্থানে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত বছর অক্টোবরে বঙ্গভবনের সামনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের দাবিতে আয়োজিত বিক্ষোভে অংশ নেন হাদি। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা এবং প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে জাতীয় সরকার গঠনের পক্ষেও মুখর ছিলেন তিনি। গত বছর ফেব্রুয়ারিতে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক বাড়ি ভাঙার ঘটনায়ও সক্রিয় ভূমিকা রাখেন তিনি।

গুলিবিদ্ধ হওয়ার মাসখানেক আগেই হত্যার হুমকি পাওয়ার কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন হাদি। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সমর্থকরা তাঁকে হত্যার হুমকি দিচ্ছিল বলে সে সময় জানান তিনি। তবে জীবননাশের আশঙ্কা সত্ত্বেও ইনসাফের লড়াই থেকে পিছিয়ে না যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন হাদি।

ওসমান হাদির জন্ম ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলায়। মাদরাসায় পড়ালেখা শেষে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ভর্তি হন। স্নাতকোত্তর শেষ করে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাও করছিলেন তিনি। জুলাই অভ্যুত্থানের পর প্রথমে জাতীয় নাগরিক কমিটিতে যোগ দেন তিনি। পরে নাগরিক কমিটি থেকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) হলেও নতুন দলে যোগ দেননি হাদি। পরে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। কয়েক মাস ধরে মাঠে-ঘাটে হাদির সরব উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়।