যুদ্ধবন্দিত্বের বেদনা থেকে মানবিকতার পথচলা আছাব আলী ও জে.এ. ফ্যামিলি ফাউন্ডেশনের অঙ্গীকার
প্রকাশ: ৬:১৮ অপরাহ্ণ নভেম্বর ২৬, ২০২৫

মো: আলী শোভন, কুলাউড়া:
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার মিঠুপুর গ্রাম। সবুজে ঘেরা, শান্ত ও সম্পর্কভিত্তিক এই জনপদ থেকেই জন্ম নিয়েছে এমন এক পরিবারের নীরব মানবিক যাত্রা, যা আজ পরিচিত জে.এ. ফ্যামিলি ফাউন্ডেশন নামে।
মাতা জোবেদা বেগম (জে) এবং বাবা আকবর আলী (এ) থেকে এই নামকরণ করেন। তাঁদের স্মৃতি, মূল্যবোধ এবং পরিবারের দায়িত্ববোধ থেকেই এই উদ্যোগের সূচনা।
এই ফাউন্ডেশনের নেপথ্যের শক্তি জানাব আছাব আলী। পাঁচ ছেলে ও দুই মেয়ের বড় পরিবারের একজন সদস্য। ১৯৬৮ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার কোরে কর্মরত অবস্থায় তিনি হঠাৎ করেই বন্দি হয়ে যান। যুদ্ধের পুরোটা সময় এবং যুদ্ধোত্তর আরও প্রায় দেড় বছর সর্বমোট প্রায় ৩ বছর তিনি পাকিস্তানের শিবিরে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় দিন পার করেন।
১৯৭৩ সালে মুক্তি পেয়ে দেশে ফিরে তিনি জানতে পারেন, তাঁর বাবা আকবর আলী দুই বছর আগেই মৃত্যুবরণ করেছেন, আর মা জোবেদা বেগম দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক যন্ত্রণায় ভুগেছেন। এই বেদনাদায়ক ঘটনা তাঁর ভেতরে জন্ম দেয় এক গভীর উপলব্ধি, যে মানুষ কষ্ট বোঝে, সে-ই অন্যের পাশে দাঁড়ানোর প্রকৃত দায়িত্ব অনুভব করে।
১৯৮৬ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন, নেওয়ার পর ১৯৯৭ সালে আছাব আলী পরিবারের স্ত্রী শামসুন নাহার বেগম এবং ৪ ছেলে এবং ১ মেয়েকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। নতুন দেশে নতুন জীবন গড়ে উঠলেও তিনি কখনো ভুলতে পারেননি তাঁর দেশের মানুষদের কষ্ট ও সীমাবদ্ধতা। তাঁর বিশ্বাস ছিল, মা–বাবার স্মৃতি মানুষের উপকারে বেঁচে থাকলে সেটাই প্রকৃত সম্মান।
এই নীতির ওপর ভিত্তি করেই ফাউন্ডেশন নীরবে, কোনো প্রচার ছাড়া, মানুষের জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার চেষ্টা করে যাচ্ছে।
এই বিশ্বাস থেকেই জে.এ. ফ্যামিলি ফাউন্ডেশনের জন্ম। ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এবং ২০১৪ সালে বাংলাদেশে নিবন্ধিত হয় জে.এ. ফ্যামিলি ফাউন্ডেশন। প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই এটি তিনটি নীতিতে অবিচল, সহায়তা অনুদান নয় মানুষের ন্যায্য হক, কাজ হবে নীরবে মানুষের মর্যাদা রক্ষা করে এবং লক্ষ্য সাময়িক নয় স্থায়ী স্বনির্ভরতা তৈরি।
ফাউন্ডেশন প্রতিবছর প্রায় ১৫টি পরিবারকে স্বনির্ভর হওয়ার ভিত্তি তৈরি করে দেয়, রিকশা, ট্রাক্টর, কৃষিজমি, গৃহনির্মাণ উপকরণ, বা ছোট ব্যবসা শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী। এই সহায়তা একবারের নয় এমনভাবে দেওয়া হয় যাতে একটি পরিবার নিজের ভবিষ্যৎ নিজেরাই গড়ে তুলতে পারে।
২০১৯ সালে কোভিড (১৯) মহামারির কঠিন সময়ে কুলাউড়ায় শত শত পরিবারে খাদ্য, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেয় জে.এ. ফ্যামিলি ফাউন্ডেশন। নাম প্রকাশ ছাড়া, প্রচার ছাড়া, মানুষের সম্মান অটুট রেখে শুধু দায়িত্ববোধ থেকে করা এই সহায়তা অনেক পরিবারকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
এছাড়াও খেলাধুলায় এই ফাউন্ডেশন রেখেছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান, তরুণদের মাঠে রাখা মানে ভবিষ্যৎকে সঠিক পথে রাখা। তাই তারা ধারাবাহিকভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছে বয়েজ ক্লাব মিঠুপুর , ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় সবসময় বাড়িয়ে দিয়েছে তাদের সহযোগিতার হাত। খেলাধুলায় যুক্ত থাকার মাধ্যমে তরুণরা শৃঙ্খলা, দলগত মনোভাব এবং ইতিবাচক শক্তি অর্জন করে এটাই তাদের বিশ্বাস।
জানাব আছাব আলীর পাঁচ সন্তানই উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত। তাঁদের বড় ছেলে সুমন রহমান যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্বস্বীকৃত পরামর্শক প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন যে প্রতিষ্ঠান Fortune 100 কোম্পানির কৌশল, প্রযুক্তি রূপান্তর ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় পরামর্শ প্রদান করে। তিনি ফাউন্ডেশনের কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা, সিদ্ধান্তগ্রহণ ও তহবিল পরিচালনার নেতৃত্বে রয়েছেন। এছাড়াও তিনি ভবিষ্যতে একটি মহিলা মাদ্রাসা ও এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নিয়েছেন এবং এর কাজ অতি শিগ্রই শুরু হবে বলে বলে আমাদের জানান।
বাকি সন্তান নওশার রহমান, রাহাত রহমান, ইমন রহমান ও সাবারা রহমান সবাই যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেন এবং নিয়মিতভাবে তাঁদের উপার্জনের একটি অংশ ফাউন্ডেশনে দান করে আসছেন। তাদের অভিন্ন কথা, এটি কোনো দান নয় এটি দাদা–দাদির স্মৃতি বহন করার দায়িত্ব।
বাংলাদেশে ফাউন্ডেশনের মাঠপর্যায়ের কাজ প্রথম দেখতেন জানাব আছাব আলীর ছোট ভাই আকমল আলী। তিনি কুলাউড়া কালিটি চা বাগানের সার্ভেয়ার হিসেবে কর্মরত ছিলেন ২০২০ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর দায়িত্ব নেন তাঁর একমাত্র ছেলে রেজওয়ান এলাহী। তিনি একটি আন্তর্জাতিক কোম্পানিতে চাকরি করেও নিয়মিতভাবে প্রতিটি প্রকল্প তদারকি করে যান এবং নিশ্চিত করেন যে সহায়তা সঠিক মানুষের ঘরে পৌঁছায়।
জে.এ. ফ্যামিলি ফাউন্ডেশন কোনো প্রচারনির্ভর উদ্যোগ নয়। এটি একটি পরিবারের নৈতিক অঙ্গীকার—মানুষের মৌলিক হক মানুষের ঘরে পৌঁছে দেওয়া। যুদ্ধবন্দিত্ব, শোক, পরিবারগত সংগ্রাম এবং জীবনের অভিজ্ঞতা জানাব আছাব আলীকে শিখিয়েছে মানবতার প্রকৃত মূল্য। তাঁর সন্তানরা আজ সেই শিক্ষা বহন করছে নীরবতায়, দায়িত্বে, এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর।