রাধারমণ দত্তের এলাকায় গান-বাজনা বন্ধে আবেদন
প্রকাশ: ১২:৫৯ পূর্বাহ্ণ অক্টোবর ২৯, ২০২৬

ছবি: অনলাইন থেকে নেওয়া।
স্টাফ রিপোর্টার, জালালাবাদ বার্তাঃ
বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের দিরাইয়ের বাউলগানের আসর নিয়ে আপত্তির পর এবার সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে ধামাইল গানের প্রবর্তক বৈষ্ণবকবি রাধারমণ দত্তের সমাধিস্থলসংলগ্ন এলাকায় গানবাজনা বন্ধের আবেদন করা হয়েছে।
গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে এ আবেদন করেন কেশবপুর ইসলামিক অর্গানাইজেশন কমিটির সদস্যরা। কেশবপুর কবরস্থানসংলগ্ন এলাকায় গানবাজনার আয়োজন নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে তারা তা বন্ধের দাবি জানান।
আবেদনে বলা হয়, কেশবপুর বাজারসংলগ্ন কবরস্থান এলাকায় মরমি সাধক রাধারমণ দত্তের নাম ব্যবহার করে গানবাজনাসংশ্লিষ্ট ‘অনৈসলামিক’ কার্যক্রমের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলার অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন আবেদনকারীরা। জনস্বার্থে এ কার্যক্রম বন্ধের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
আবেদনে গ্রামের বাসিন্দা কাদির মিয়া, রফিক মিয়া, মো. তৈমুর আলী, আনকার, খালেদ, সোহেল, মো. রফিকুল, জাহাঙ্গীর, আবু মিয়া, মো. রফিক আলী, দিলা মিয়া, ওয়াহিদ, ইকবাল, আবু তাহের, আওলাদ ও তারেক মিয়াসহ অনেকে স্বাক্ষর করেছেন।
এ বিষয়ে জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইসলাম উদ্দিন বলেন, রাধারমণ দত্তের প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে আগামী ৯ ও ১০ নভেম্বর অনুষ্ঠান হওয়ার কথা রয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা প্রশাসনের পরামর্শে উপজেলা প্রশাসন এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আগামী ১ নভেম্বর প্রস্তুতিমূলক সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, অনুষ্ঠান সাধারণত উপজেলা সদরে হয়। এ ছাড়া অন্য কোথাও আয়োজনের বিষয়ে তার জানা নেই। কোনো সাংস্কৃতিক সংগঠন এ ধরনের আয়োজনের অনুমতি নেয়নি। রাধারমণ দত্তের সমাধিস্থলের পাশে কবরস্থান থাকায় গানবাজনার আয়োজনের খবর শুনে স্থানীয় বাসিন্দারা হয়তো আবেদন করেছেন।
ধামাইল সংগীত ও নৃত্যের প্রবর্তক বৈষ্ণবকবি রাধারমণ দত্তের সমাধিস্থল জগন্নাথপুর উপজেলার কেশবপুর গ্রামে। তার রচনাবলি বাংলা লোকসংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। দীর্ঘদিন ধরে তার সমাধিস্থল এলাকায় সাংস্কৃতিক চর্চা হয়ে আসছে। প্রতিবছর স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রশাসনের সহযোগিতায় রাধারমণ উৎসবের আয়োজন করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, আগে এ আয়োজন কখনও বাধার মুখে পড়েনি।
জগন্নাথপুর উপজেলা সদরের এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাধারমণ দত্তের সমাধিস্থলের পাশে কবরস্থান রয়েছে, এটি ঠিক। তবে আগে সেখানে দুই দিনব্যাপী গানের অনুষ্ঠান হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে সেখানে আর অনুষ্ঠান হচ্ছে না।
কেশবপুর গ্রামের বাসিন্দা ও উপজেলা ক্রীড়া সংগঠক আবু হেনা রনি বলেন, ২০২৩ সালের আগ পর্যন্ত রাধারমণ দত্তের সমাধিস্থলে প্রতিবছর দুই দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। এসব অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ (ইউএনও) অনেকে উপস্থিত থাকতেন। তবে গত দুই বছর ধরে সেখানে কোনো অনুষ্ঠান হচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, সমাধিস্থলের পাশে কবরস্থান রয়েছে, এটি ঠিক। তবে কবরস্থানটি আগেও ছিল। তখন অনুষ্ঠান আয়োজনে কেউ বাধা দেননি বা আপত্তি তোলেননি।
উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী কেন্দ্রীয় সংসদের সহসভাপতি ও গণমাধ্যমকর্মী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, গানবাজনায় নিষেধাজ্ঞা দেশের সংস্কৃতিচর্চাকে সংকুচিত করবে। হাসন রাজা, রাধারমণ দত্ত, দুর্বীন শাহ ও শাহ আবদুল করিমসহ অনেক গুণী সাধক সুনামগঞ্জের গর্ব। তারা নিজেদের সৃষ্টির মাধ্যমে সুনামগঞ্জের পরিচিতি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছেন। রাধারমণের জন্মভিটা এলাকায় এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা কাম্য নয়।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রশাসন অনুষ্ঠান আয়োজনের অনুমতি দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
এর আগে গত ২২ অক্টোবর দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের হাতিয়া গ্রামে ‘গানের নামে অশ্লীলতা’র অভিযোগ তুলে পারিবারিক বাউলগানের আসর বন্ধের আবেদন করা হয়েছিল পুলিশের কাছে। আপত্তি সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত ওই গ্রামে নারী শিল্পীদের নিয়ে সীমিত পরিসরে অনুষ্ঠানটি হয়। যুক্তরাজ্যপ্রবাসী শওকত আলী তার মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষে ওই আয়োজন করেছিলেন।
এ ছাড়া দিরাইয়ে ইসলামবিরোধী কার্যকলাপ প্রতিরোধ কমিটির আপত্তির মুখে উপজেলা সদরের স্টেডিয়ামে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বাতিল করা হয়। গত ৫ অক্টোবর স্থানীয় স্বপ্নচূড়া স্পোর্টিং ক্লাব ও সিলেটের জারা স্পোর্টিং ক্লাবের মধ্যে ম্যাচটি হওয়ার কথা ছিল। এসব ঘটনা স্থানীয় পর্যায়ে সংস্কৃতিচর্চা ও ক্রীড়া আয়োজন নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। খবর: এশিয়া পোস্টের।