উওম কুমার গোমস্তাপুর (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) প্রতিনিধিঃ

চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে যোগ হয়েছে নতুন এক দুঃস্বপ্ন—বেওয়ারিশ কুকুরের উপদ্রব। উপজেলায় প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে কুকুরের তাড়া খাওয়ার ঘটনা। রাস্তায় হাঁটতে বের হলেই শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও পথচারীদের মনে আতঙ্ক, মোড়ে মোড়ে অসংখ্য কুকুর। কুকুরের আতঙ্কে শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের চলাফেরা করা বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে।

 
বিশেষ করে রাতের বেলা কুকুরের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায়। রাত বাড়ার সাথে সাথে সড়ক ফাঁকা হলেই তারা পথচারীদের আক্রমণ করে। পথচারী ছাড়াও চলন্ত রিকসা, সিএনজি অটোরিকসা, মোটরসাইকেলের যাত্রীদেরও সুযোগ বুঝে ধাওয়া দিচ্ছে এতে করে চালকদের জন্য দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়েছে বহুগুণ।

রেহাই পাচ্ছে না  ছাগল, ভেড়া, হাঁস মুরগী মতো ছোট ছোট প্রাণী গুলো। এদের আক্রান্ত করছে এবং জায়গা ভেদে ছাগল, ভেড়া, হাঁস মুরগীর মত প্রাণী গুলোকে আক্রান্ত করে খেয়ে ফেলছে। ফলে উপজেলায় বেওয়ারিশ কুকুরের আক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।

 

সরজমিনে দেখা যায়, রহনপুর পৌর এলাকার আহম্মদী বেগম (এবি) সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, তোজ্জামেল হোসেন প্রি-ক্যাডেট স্কুল, রহনপুর গাজি শিশু শিক্ষা নিকেতন কেজি স্কুল, রহনপুর রাবেয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, রহনপুর স্টেশন বাজার, কলেজ মোড়, কলোনি মোড়, মুক্তাশা হল মার্কেট, রহনপুর বড় বাজার, খোয়াড় মোড়সহ উপজেলার ৮টি  ইউনিয়নের মোড়, বাজার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশেপাশে দলবেঁধে ঘোরাফেরা করছে বেওয়ারিশ কুকুর এতে বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা প্রতিদিনই আতঙ্ক নিয়ে যাতায়াত করছে।

 

জানা গেছে, বেওয়ারিশ কুকুর ৭ থেকে ৮টির সংগবদ্ধ দল আকারে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং মানুষকে কামড়াচ্ছে। বর্তমানে  কুকুর আতঙ্কে চলাফেরা করছে পথচারীরা। শিশুদের নিয়ে অভিভাবকরা বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। এছাড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বেওয়ারিশ কুকুরের সখ্যা যেমন বেড়েছে নাগরিক জীবনে কিন্তু এর প্রভাব ফেলেছে। ফলে বেড়েছে হাসপাতালে আক্রান্ত রুগীর সংখ্যা।

 

শিক্ষার্থী সানজিদা শারমিন বলেন, প্রায়ই ৯-১০টি বেওয়ারিশ কুকুর একসঙ্গে থাকে থাকে। দেখলেই ভয় লাগে। তাদের থেকে অনেক দূর দিয়ে হেঁটে তাদের অতিক্রম করতে হচ্ছে।

অভিভাবক মেসবাহুল ইসলাম বলেন, কয়েকদিন থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়ুয়া মেয়েকে সাথে করে স্কুলে নিয়ে যেতে হয় আবার ছুটির সময় সাথে করে নিয়ে আসতে হচ্ছে। রাস্তায় এতো কুকুরের আনাগোনা যে যেকোন সময় কামড়াতে পারে। বেওয়ারিশ কুকুর নিয়ে আতঙ্কে রয়েছি।

অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. মাইনুল ইসলাম জানান, কুকুর কামড়ালে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভ্যাকসিন নেই। এদিকে আক্রমণের ঘটনা ঘটেই চলেছে। এতে আর্থিক ও মানুসিক ভোগান্তি বাড়ছে। এ বিষয়ে এখনই পদক্ষেপ না নিলে আগামীতে বড় দুর্ঘনা ঘটতে পারে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আব্দুল হামিদ জানান, গত অর্থবছর থেকে চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমাদের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রায় ১২৪ জন কুকুরে আক্রান্ত রুগী চিকিৎসা নিয়েছে।

এর বাইরেও বিভিন্ন অঞ্চলে  গ্রাম্য ডাক্তার, কবিরাজের কাছে রুগী চিকিৎসা নিয়ে থাকতে পারে। সরকারি ভাবে ভ্যাকসিন দেওয়া হয় কিন্ত আমাদের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরবরাহ নেই।  ভ্যাকসিন সরবরাহ না থাকায় মাঝে মধ্যে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। নতুন ভাবে ভ্যাকসিন চাওয়া হয়েছে সেগুলো পেলে রুগীদের সেবা দেওয়া হবে।

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম প্রামাণিক জানান,  উপজেলায় একটি রুগী কল্যাণ সমিতি আছে। সেখানে গরীব ও অসহায় রুগীদের জন্য একটি আবেদন ফরম রয়েছে। যারা অর্থের অভাবে ভ্যাকসিন ও ঔষুধ কিনতে পারে না তারা নির্ধারিত ফরমে আবেদন  করলে সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে আর্থিক সহয়তা করে থাকে। গত অর্থবছরে কুকুরে আক্রান্ত ২৮টি রুগীকে ৮১টি ভ্যাকসিন কিনা বাবদ ৪০ হাজার ৫০০ টাকা সহয়তা করা হয়েছে । 

 
কুকুরে আক্রান্ত রুগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। যেহুতু কুকুরে আক্রান্ত হওয়ার ২৪ ঘন্টার মধ্যে ভ্যাকিসন নিতে হবে। কিন্তু ছুটির দিন ও সাপ্তাহিক ছুটির দিন গুলোতে অফিস বন্ধ থাকায় গরীব অসহায় রুগীরা এ সেবা থেকে বঞ্চিত হয়। সরকারি ভাবে ভ্যাকসিন সরবরাহ করা হলে এ সমস্যা আর থাকবে না। তাই সরকারি ভাবে ভ্যাকসিন  সরবরাহ জরুরি হয়ে পড়েছে।

উপজেলা প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তা ড. মো. ওয়াসিম আকরাম জানান, উপজেলা প্রাণীসম্পদ কমপ্লেক্সে সরকারি কোন ভ্যাকসিন সরবরাহ নেই। আমাদের উপজেলা প্রাণিসম্পদ কমপ্লেক্সে প্রতি মাসেই প্রায় ১০-১২ টি করে কুকুরে আক্রান্ত ছাগল ভেড়াসহ অন্যন্য প্রাণীকে চিকিৎসা দিয়ে থাকি। সরকারি ভ্যাকসিন না থাকায় চিকিৎসা দিতে আমরা মাঝে মধ্যেই বিড়ম্বনায় পড়ছি।

 এ সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বেওয়ারিশ  কুকুর গুলোকে যদি প্রতিবছর একবার করে র‍্যাবিস ভ্যাকসিন দেওয়া হয় তবে কুকুর কোন মানুষকে বা অন্য কোন প্রাণীকে কামড় দিলে জলাতঙ্ক রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। কিন্ত সরকারি ভাবে কোন উদ্যেগ না থাকায় বেওয়ারিশ কুকুরকে শনাক্ত করে সেগুলোকে প্রতিষেধক দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি আরো জানান সড়কের পাশে যত্রতত্র ময়লা ফেলার অভ্যাসই কুকুর উপদ্রবের বড় একটা কারণ । বিশেষ করে ডাস্টবিনের পাশে জমে থাকা আবর্জনা ছিঁড়ে খাবার সংগ্রহ করে সেখানেই দল বেঁধে অবস্থান নেয় কুকুরগুলো। ফলে পুরো উপজেলার বিভিন্ন স্পটে কুকুরের বিচরণ বেড়েছে। বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে জনজীবনে উপদ্রব সৃষ্টি হয়, যা জলাতঙ্ক ও আক্রমণের মতো জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ায়। তবে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাণী অধিকার রক্ষা করে মানুষের জীবনযাত্রা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাকির মুন্সী জানান, বেওয়ারিশ কুকুর এখন বড় এক নাগরিক সমস্যা। প্রতিদিনের পথচলায় যে আতঙ্কে ভরে উঠছে, তা কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি হয়ে উঠেছে। শুধু ভ্যাকসিনে নয়, যত্রতত্র ময়লা ফেলার প্রবণতা বন্ধ, পরিচ্ছন্নতা বৃদ্ধি এবং সচেতনতা বাড়ানোই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।