উওম কুমার  গোমস্তাপুর (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) প্রতিনিধিঃ দিনে মেঘের লুকোচুরি, রাতে ২/১দিন পর পর বৃষ্টি এমন অনিশ্চিত আবহাওয়ার মধ্যে  বোরো ধান ঘরে তোলা নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন পার করছে বিলঞ্চলের কৃষকরা। চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরের বিলঞ্চলে শ্রমিক সংকট ও বাড়তি খরচের চাপে কৃষকরা দিশেহারা। 

এবারের বোরো মৌসুমে ফসল ঘরে তোলা যেন আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই অঞ্চলের কৃষকদের। এই বিলঞ্চলের প্রান্তিক কৃষকদের বোরো ধানের ফসলই সারা বছরের একমাত্র ভরসা। এই ফসল ঘরে তুলতে পারলেই যেন তাদের সারা বছরের স্বপ্ন পূরণ হয়।

তবে গত কয়েক বছরের মত এ মৌসুমেও বোরো ফসল ঘরে তোলা নিয়ে অনিশ্চতায় দিন পার করছে কৃষকরা। চলতি মৌসুমে বিলঞ্চলের কৃষকদের দাবি পুনর্ভবা নদীর উপর ব্রিজ নির্মান, পুনর্ভবা নদী পূর্ণ খনন না হওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে।

মৌসুমের শুরুতেই ভারতের উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানি ও আগাম বৃষ্টির প্রভাবে রাধানগর ইউনিয়ন কুজনঘাটের বিলঞ্চল এলাকায় শুধু প্লাবিত হয়েছিলো প্রায় হাজার বিঘা বোরো ধানের জমি। এতে কৃষকেরা আধ-পাকা ধান কাটা শুরু করেছিলেন। কিন্তু বর্তমানে শ্রমিক সংকট ও বাড়তি খরচের চাপে কৃষকদের সারা বছরের স্বপ্ন ভেসতে যেতে বসেছে।

সরজমিনে উপজেলার কুজনবিল, বড় বিলঞ্চল ও চুরইল বিলঞ্চলসহ কয়েকটি বোরো ধানের মাঠ ঘুরে দেখা গেছে,   শুধু  কুজনঘাটের বিলঞ্চলই নয় আগাম বৃষ্টির প্রভাবে পুরো উপজেলায় শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে।

আর যে কৃষকদের ২/৩ বিঘা করে বোরো ধানের আবাদ রয়েছে তাদের  ধান কর্তনের  জন্য শ্রমিক পাওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে যাচ্ছে। কারণ ২/৩ বিঘা জমির ধান কর্তনে ধানের যে মজুরি তা কম হয়ে যাওয়ার ফলে  ধান কর্তনে আগ্রহী নয় শ্রমিকরা। তাই এসব ধান কর্তনে শ্রমিরা কৃষকদের সাথে চুক্তি বদ্ধ করছে  দিন প্রতি ১হাজার টাকা ও তাদরে খোরাকী দিতে হবে বলে।

একদিকে শ্রমিক সংকট অন্যদিকে পাল্লা দিয়ে ধান বহনকারী ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলারের মালিকরা তাদের গাড়ির ভাড়া বাড়িয়েছে দ্বিগুণ। 

আগের বছর যেখানে ট্রাক্টরে এক টলি ধান বহন করার জন্য ভাড়া নিতেো ১০০০ হাজার টাকা চলতি মৌসুমে সেখানে নেওয়া হচ্ছে ১৫০০ থেকে ২০০০হাজার টাকা, পাওয়ার টিলারে নেওয়া হতো ১হাজার টাকা এখন সেখানে নেওয়া হচ্ছে ১৫০০ টাকা। 

বর্তমানে ধান কর্তনের উপযুক্ত সময় হলেও আবহাওয়া অনুকূল না থাকায় দূর্যোগের ছায়া যেন কাটছে না। 

কিছু কিছু জমির ফসল এখন নষ্ট হওয়ার উপক্রম হলেও তা দ্রুত ঘরে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছে কৃষকরা। এতেই দেখা দিয়েছে তীব্র শ্রমিক সংকট। ফলে শ্রমিক মজুরি বেড়েছে দ্বিগুণ।

এদিকে জমি থেকে নৌকা, নৌকা থেকে জমিন আবার ট্রাক্টরে আবার জমিনে এই ভাবে ৫ থেকে ৬ জায়গায় ধান লোড আনলোডে ধান ঝরে নষ্ট হওয়ায় উৎপাদন কমেছে বিঘা প্রতি ৫ থেকে ৬ মন ধান। এসব বাদ দিয়ে কৃষকরা উৎপাদন পাচ্ছে বিঘা প্রতি ১৫ থেকে ১৬ মন। এখনও ৪০ শতাংশ ধান বিলঞ্চলে রয়েছে । 

কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় মোট আবাদি জমির পরিমান ২৩ হাজার ৬৬৩ হেক্টর তার মধ্যে বোরো আবাদ রয়েছে ১৪ হাজার  ৮৩৫ হেক্টর এর মধ্যে বিলঞ্চলে বোরো আবাদ রয়েছে প্রায়  ৫ হাজার হেক্টর এবং কুজনবিল বিলাঞ্চলেই বোরো আবাদ প্রায় ২ হাজার হেক্টর। এই বিলঞ্চলের ৪০ ভাগ ধান এখন বিলঞ্চলে রয়েছে।

কুজনবিলের কৃষক মুক্তার হোসেন জানান, আমি সাড়ে ৩ বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করেছি, কুজনবিল বিলাঞ্চল প্লাবিত ও বৃষ্টির প্রভাবে ধান ঘরে তুলতে খরচ হচ্ছে  বিঘা প্রতি শ্রমিক খরচ ৭ হাজার টাকা, নৌকা ধান পার করতে ৩ হাজার টাকা, আবার ট্রাক্টরে বাসায় ধান নিয়ে যেতে ২ হাজার টাকা ও ধান মাড়ায়ে ২ হাজার টাকা। ধান রোপন থেকে ধান কাটা পর্যন্ত বিঘা প্রতি খরচ ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা।

 সব মিলিয়ে এক বিঘা জমির ধান চাষ থেকে শুরু করে ঘরে তুলতে খরচ প্রায় ২২ হাজার থেকে ২৪ হাজার টাকা। বিঘা প্রতি ধানের উৎপাদন পাচ্ছি ১৫ থেকে ১৬ মন। সব মিলিয়ে এবার আমার লোকসান হবে বিঘা প্রতি ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা।

এ বিষয়ে গোমস্তাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. সাকলাইন হোসেন জানান, শ্রমিক সংকট নিরসনে প্বার্শবর্তী জেলা উপজেলা থেকে শ্রমিক এসে আপদকালীন সময়ে কাজ করছে। 

তবে প্রকৃতপক্ষে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ তথা সুলভ ও ভূর্তুকি মূল্যে কম্বাইন হারভেস্টার,রিপার থ্রেসার সহ অন্যান্য মেশিন সরবরাহ করা ও সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন করা গেলে এ সংকট কাঠিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। বর্তমান সরকার এ বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহন করার পরিকল্পনা গ্রহন করছে,আশা করি পরবর্তীতে এ সংকট থেকে উত্তরণ হওয়া সম্ভব হবে।