
আবু সায়েম মোহাম্মদ সা’-আদাত উল করীম: জামালপুরের অন্যতম স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান জামালপুর ডায়াবেটিস জেনারেল হাসপাতাল-এর প্রশাসনিক কার্যক্রম, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা কাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসছে। হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারী, সমিতির কয়েকজন সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
অভিযোগকারীদের দাবি, হাসপাতাল পরিচালনাকারী সমিতির গঠনতন্ত্র একাধিকবার সংশোধন করা হলেও সেসব সংশোধনের যথাযথ সরকারি অনুমোদনের তথ্য পাওয়া যায়নি। তাঁদের ভাষ্য, প্রতিষ্ঠাকালীন গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে পরপর দুই মেয়াদের বেশি দায়িত্ব পালনের সুযোগ না থাকলেও দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে একই ব্যক্তি সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এ বিষয়টি নিয়ে সমিতির সদস্যদের একাংশের মধ্যে প্রশ্ন ও অসন্তোষ রয়েছে।
একাধিক সূত্রের অভিযোগ, হাসপাতালের আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণে নির্ধারিত বিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না। নিয়মিত ও স্বাধীন অডিটের পরিবর্তে নামমাত্র অডিটের মাধ্যমে প্রকৃত আর্থিক চিত্র আড়াল করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতালের ক্রয়প্রক্রিয়া, ভাউচার সংরক্ষণ, স্টোর ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতার ঘাটতির অভিযোগও তুলেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারী।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সমাজসেবা অধিদপ্তরের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি অনুসারে নির্দিষ্টসংখ্যক অসচ্ছল রোগীকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হচ্ছে না। তবে এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
জেলা পরিষদের অনুদানে আইসিইউ স্থাপনের উদ্যোগ দীর্ঘদিনেও বাস্তবায়িত না হওয়ায় অনুদানের অর্থের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, প্রকল্পটির অগ্রগতি এবং অর্থ ব্যবহারের বিষয়ে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসকের পদবি, উচ্চতর ডিগ্রি ও নিবন্ধন নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আজিজুল হক জানান, লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ লক্ষ্যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে চিকিৎসকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, নবায়নকৃত বিএমডিসি নিবন্ধন এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, পদোন্নতি, বেতন ও সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে বৈষম্য রয়েছে। তাঁদের দাবি, অনিয়মের প্রতিবাদ বা ভিন্নমত প্রকাশ করলে মানসিক চাপ, হয়রানি এবং চাকরি হারানোর আশঙ্কার মধ্যে থাকতে হয়। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এই প্রতিবেদকের পক্ষে সম্ভব হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ তরিকুল ইসলাম বলেন, তিনি দীর্ঘদিন সুনামের সঙ্গে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে আসছেন। তাঁর দাবি, একটি স্বার্থান্বেষী মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে এবং অভিযোগগুলোর বাস্তবভিত্তি নেই।
সমিতির সদস্য প্রার্থ প্রতিম (পথিক) নন্দী বলেন, তিনি কোনো নিয়োগ বা ক্রয় কমিটির সদস্য নন এবং ব্যক্তিগত স্বার্থে প্রতিষ্ঠানের কোনো কার্যক্রমে জড়িত নন। তাঁর বক্তব্য, একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটিত হবে।
হাসপাতালের সেবাগ্রহীতা, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং অভিযোগকারীরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সমাজসেবা অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং অভিযোগ অসত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের দায়মুক্তি নিশ্চিত করা উচিত। তাঁদের আশা, একটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে হাসপাতালের সুশাসন, জবাবদিহি ও জনআস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।