
কাকন সরকার, শেরপুর প্রতিনিধি: ফেলে দেওয়া মানুষের চুল এখন আর আবর্জনা নয়, বরং শেরপুরের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। শেরপুর সদর উপজেলার বিশেষ করে পাকুড়িয়া ও ধলা ইউনিয়নে এই ফেলে দেওয়া চুল প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে যুক্ত হয়ে শেরপুর সদরে কর্মসংস্থান খুঁজে পেয়েছেন প্রায় ১০ হাজার নারী শ্রমিক। দিনমজুর হিসেবে কাজ করে তারা এখন সংসারে সচ্ছলতা ফেরাচ্ছেন।
পাকুড়িয়া ইউনিয়নের এক সফল চুল ব্যবসায়ী মো: আ: বারেক জানান, এক সময় যা মানুষ ফেলে দিত, সেই চুল এখন আক্ষরিক অর্থেই ‘সোনার চেয়ে দামি’ বস্তুতে পরিণত হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বিভিন্ন হকার বা ফেরিওয়ালারা দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চল ঘুরে সাধারণ মানুষের ফেলে দেওয়া চুল সংগ্রহ করেন। এরপর তারা স্থানীয় বাজারে খুচরা দোকানদারদের কাছে তা বিক্রি করেন। পাইকারি ব্যবসায়ীরা সেই দোকানদারদের কাছ থেকে প্রতি কেজি কাঁচা চুল ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা দরে কিনে নেন।
সংগৃহীত এই চুলগুলো কারখানায় এনে নারী শ্রমিকদের মাধ্যমে যত্নের সাথে পরিষ্কার করা হয়। এরপর মেশিনের সাহায্যে চুলগুলো সোজা (স্ট্রেইট) করে দৈর্ঘ্য বা সাইজ অনুযায়ী বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়।
কারখানায় কর্মরত নারী শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা যায় এক অনুপ্রেরণাদায়ক চিত্র। তারা জানান, এই কাজের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—তারা তাদের সংসারের রান্নাবান্না, সন্তান লালন-পালনসহ সব কাজ শেষ করেই এই প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ করতে পারেন।
বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হওয়ায় তারা অত্যন্ত আনন্দিত। নারী শ্রমিকরা সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “সংসারের নিয়মিত কাজের পাশাপাশি এই কাজ করে আমরা বাড়তি টাকা ইনকাম করতে পারছি। এই টাকা দিয়ে আমরা আমাদের পরিবার ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালাতে পারছি, যা আমাদের অনেক বড় স্বস্তি ও খুশি দিচ্ছে”
প্রক্রিয়াজাত করা এই চুলগুলোর মূল বাজার মূলত বিদেশে। তবে দেশের সাধারণ ব্যবসায়ীরা সরাসরি বিদেশি ক্রেতাদের (বায়ার) কাছে এগুলো রপ্তানি করতে পারেন না। মধ্যস্বত্বভোগী বা ভায়ার মাধ্যমে এই চুল বিদেশে পাঠাতে হয়।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে চুলের চাহিদা ব্যাপক। দৈর্ঘ্য বা সাইজ অনুযায়ী প্রতি কেজি প্রক্রিয়াজাত করা চুল বর্তমানে ৭০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ১ লাখ ২০ বা ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ী মো: আ: বারেক আক্ষেপ করে বলেন, “আমরা যদি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় সরাসরি বিদেশি বায়ারদের কাছে এই চুল বিক্রি করতে পারতাম, তবে আরও অনেক বেশি দাম পেতাম এবং দেশ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারত।”
তিনি আরও জানান, এই ব্যবসা অত্যন্ত লাভজনক হলেও এটি বেশ ব্যয়বহুল। বর্তমানে ছোট পরিসরেও এই ব্যবসা শুরু করতে গেলে কমপক্ষে ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকার নগদ পুঁজি (ক্যাশ) প্রয়োজন হয়, যা সাধারণ ব্যবসায়ীদের পক্ষে জোগাড় করা অসম্ভব।
তাই এই সম্ভাবনাময় কুটির শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দিতে সরকারের কাছে দুটি দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা:
১. সরাসরি বিদেশে রপ্তানি করার সরকারি সহজ সুযোগ ও ব্যবস্থা করা।
২. ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ শর্তে ‘সুদমুক্ত বা স্বল্পসুদে’ ব্যাংক লোনের (ঋণ) ব্যবস্থা করা।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারি সহযোগিতা পেলে শেরপুরের এই চুল শিল্প নারীদের স্বাবলম্বী করার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও বড় অবদান রাখতে পারবে।