
চরফ্যাশন (ভোলা)প্রতিনিধিঃ জ্বালানি তেল, নির্মাণসামগ্রী ও চাল-ডালের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য পাচারের প্রতিযোগিতায় নেমেছে ভোলার মনপুরা উপজেলার একটি প্রভাবশালী চক্র। মাছ ধরার ট্রলারের আড়ালে এসব পণ্য প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে পাচার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পাচার শেষে ট্রলারগুলো ফিরে আসার সময় নিয়ে আসছে কোটি কোটি টাকার মাদকের চালান।
অনুসন্ধানে এই সক্রিয় পাচারকারী চক্রের ১৯ জন সদস্যের নাম উঠে এসেছে। তারা হলেন—খলিল মাঝি, শাহাবুদ্দিন সেরাং, মজিদ মাঝি, ফুয়াদ, নুরইসলাম, হারুন সেরাং, মালেক মাঝি, হান্নান মাঝি, কাসেম শিকদার, নুরনবী মাঝি, সিরাজ মাঝি, মিজান, রাকিব, জহির সেরাং, শরিফ সেরাং, শাহীন সেরাং, আলমগীর মাঝি, আবুল মাঝি ও জাহাঙ্গীর মাঝি। অভিযুক্তরা সবাই মনপুরা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বাসিন্দা। পেশায় জেলে হলেও তারা সমুদ্র উপকূল ব্যবহার করে কৌশলে এই পাচার বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চক্রটি নোয়াখালীর হাতিয়া থেকে জ্বালানি তেল ও ভোগ্যপণ্য সংগ্রহ করে মনপুরার সমুদ্র উপকূল হয়ে রাতের আঁধারে নিঝুম দ্বীপের পূর্ব পাশে অবস্থিত ‘দমার চর’-এ নিয়ে যায়। শুল্ক-কর ফাঁকি দিয়ে প্রতিটি ট্রলারবোঝাই পণ্য মিয়ানমারে খালাস করার বিনিময়ে তারা মোটা অঙ্কের অর্থ পায়। ফিরতি পথে তারা নিয়ে আসে মাদক, যা স্থানীয় ডিলারদের কাছে তিনগুণ দামে বিক্রি করা হয়।
সূত্রের দাবি, পাচারের এই ধারাটি শুরুতে কয়েকজন শুরু করলেও বর্তমানে এর নেতৃত্বে রয়েছেন দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ভেলু মাঝির ছেলে ফুয়াদ। গত তিন মাস ধরে সাগরে মাছ ধরার ছদ্মবেশে এই চক্রটি সক্রিয় রয়েছে। পাচারকারী এই চক্রের আরও কয়েকজন সদস্য চরফ্যাশন উপজেলায়ও রয়েছে বলে জানা গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক জেলে জানান, গত ৯ মে দিবাগত রাতে মনপুরার তালতলা এলাকা থেকে শাহিন সেরাং, মজিদ সেরাং, হারুন সেরাং ও জহির সেরাং-এর ৪টি ট্রলার এবং ১২ এপ্রিল দিবাগত রাতে জনতাবাজার মৎস্যঘাট থেকে হারুন সেরাং-এর ট্রলার পণ্য নিয়ে যাত্রা করে।
এছাড়া ১৩ এপ্রিল সন্ধ্যায় চরফ্যাশনের সামরাজ মৎস্যঘাট থেকে আলমগীর মাঝি, আবুল মাঝি, মজিদ মাঝি ও জাহাঙ্গীর মাঝির একাধিক ট্রলার মিয়ানমারের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান অভিযুক্ত ফুয়াদ বলেন, ‘আমি তেল বিক্রি করি। আমার আন্ডারে ১০টি ট্রলার আছে। তারা আমার কাছ থেকে তেল কিনে কী করে তা আমি জানি না।’ তবে অভিযুক্ত অন্যদের মধ্যে শাহিন সেরাং, মজিদ সেরাং, হারুন সেরাং, জহির সেরাং এর মুঠোফোন বন্ধ থাকায় তাদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। হাতিয়া কোস্টগার্ড কন্টিনজেন্ট কমান্ডার জানান, ইতিমধ্যে পাচারকারী চক্রের বেশ কিছু মালামাল ও ট্রলার জব্দ করা হয়েছে। সাগরের বিভিন্ন চ্যানেলে কোস্টগার্ডের নিয়মিত টহল অব্যাহত রয়েছে।
মনপুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফরিদ উদ্দিন জানান, সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে যারা পাচার কাজে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভোলার পুলিশ সুপার মো. শহিদুল্লাহ কাওছার বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবগত। যেহেতু এটি সমুদ্রপথের বিষয়, তাই নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। কোনো জেলের জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে অবশ্যই তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’