
🔘 আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ
দীর্ঘ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা ভয়াবহ সংঘাতের পর অবশেষে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে ইরান। গত ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধের এক চরম উত্তেজনাকর মুহূর্তে দুই সপ্তাহের সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে তেহরান ও ওয়াশিংটন। ৭ এপ্রিল (মঙ্গলবার) রাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণার পর ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলও এই যুদ্ধবিরতি মেনে নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
ইরানের ওপর বড় ধরনের বিমান হামলার হুমকির মুখে পাকিস্তান ও ওমানের মধ্যস্থতায় এই সমঝোতা সম্ভব হয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ এবং সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের বিশেষ অনুরোধে ট্রাম্প প্রশাসন তাদের পূর্বনির্ধারিত বড় মাপের আক্রমণ আপাতত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করেছে। বিনিময়ে ইরান বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রুট ‘হরমুজ প্রণালী’ পুনরায় খুলে দিতে রাজি হয়েছে। আগামী শুক্রবার থেকে ইসলামাবাদের নিরপেক্ষ ভূমিতে দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে ইরানের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। জাতিসংঘের (OCHA) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী:
• হতাহতের সংখ্যা: যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ২,১০০-এর বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে বিপুল সংখ্যক নারী ও শিশু রয়েছে।
• অবকাঠামোগত ধ্বংসযজ্ঞ: তেহরান, ইসফাহান এবং শিরাজসহ গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে ভয়াবহ বিমান হামলায় প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৭ শতাধিক স্কুল এবং শত শত হাসপাতাল ও জরুরি সেবা কেন্দ্র রয়েছে।
• বিদ্যুৎ ও পানি সংকট: শিল্পাঞ্চল ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে হামলার কারণে ইরানের বড় একটি অংশ এখন বিদ্যুৎহীন। বিশুদ্ধ পানির চরম সংকট দেখা দিয়েছে, যা একটি মানবিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে দেশটিকে।
হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১২০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তবে যুদ্ধবিরতির খবর আসার পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ১০ শতাংশের বেশি কমেছে। অন্যদিকে, ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি প্রায় ১০ শতাংশ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। যুদ্ধের ফলে দেশটির ড্রোন ও মিসাইল উৎপাদন কেন্দ্রের প্রায় ৬৬ শতাংশই ধ্বংস হয়ে গেছে বলে দাবি করেছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM)।
বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো এই ইস্যুতে বিভক্ত। রাশিয়া ও চীন এই সংকটের জন্য মার্কিন-ইসরায়েল জোটকে দায়ী করলেও ব্রিটেন ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলো হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখার জন্য ইরানের সমালোচনা করেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই যুদ্ধকে ‘অবৈধ’ অ্যাখ্যা দিয়ে দ্রুত রাজনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।
সাময়িকভাবে বোমাবর্ষণ থামলেও ইরানের আকাশ থেকে এখনো যুদ্ধের মেঘ পুরোপুরি কাটেনি। আগামী দুই সপ্তাহের আলোচনা যদি সফল না হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্য এক ভয়াবহ দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের কবলে পড়তে পারে। আপাতত সাধারণ ইরানি নাগরিকরা ধ্বংসস্তূপের মাঝেই নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন।