🔹 রুহুল চৌধুরী, সম্পাদক, জালালাবাদ বার্তাঃ

বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে নিত্যপণ্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি আর জ্বালানি সংকটে জনজীবনে নাভিশ্বাস। ২০২৬ সালের এই বসন্ত যেন কেবল ঋতু পরিবর্তনের বার্তা নয়, বরং জাতীয় রাজনীতি ও অর্থনীতিতে এক বড় ধরনের পালাবদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন উত্তপ্ত। একদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার তাদের শাসনতান্ত্রিক সংস্কারের এজেন্ডা নিয়ে এগোচ্ছে, অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন দাবিতে রাজপথে সক্রিয়তা বাড়ছে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে সরকার ও বিরোধী জোটের মুখোমুখি অবস্থান গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য ইতিবাচক হলেও জনমনে শঙ্কা তৈরি করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি টেকসই স্থিতিশীলতার জন্য সব দলের মধ্যে ন্যূনতম জাতীয় ঐক্য এখন সময়ের দাবি। নাহলে ‘গণভোট’ বা ‘সংবিধান সংস্কার’ এর মতো মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
জাতীয় অর্থনীতির চিত্রটি বেশ জটিল। যদিও রিজার্ভের স্থিতিশীলতা (প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলার) এবং রেমিট্যান্সের প্রবাহ কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে, কিন্তু অভ্যন্তরীণ বাজারে তার প্রতিফলন সামান্যই।
পেঁয়াজ, ভোজ্যতেল আর চালের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। ৫ এপ্রিলের বাজার দর অনুযায়ী, স্বর্ণের দাম ভরিতে আড়াই লাখ টাকা ছুঁইছুঁই, যা পরোক্ষভাবে মুদ্রা স্ফীতির ভয়ংকর চিত্র তুলে ধরে।
লোডশেডিং আর পেট্রোল পাম্পগুলোতে তেলের দীর্ঘ লাইন গ্রীষ্মের শুরুতেই ভোগান্তিকে চরমে নিয়ে গেছে। শিল্পোৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় রপ্তানি খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আগামী ৭ এপ্রিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের ভারত সফরকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে। গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়ন এবং স্থগিত থাকা পর্যটন ভিসা পুনরায় চালুর বিষয়টি এই সফরের মূল এজেন্ডা। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো ‘গোপন চুক্তি’ নেই বলে সরকারের স্পষ্ট অবস্থান ওয়াশিংটন ও ঢাকার মধ্যকার সম্পর্কের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার একটি প্রয়াস হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে জ্বালানি আমদানিতে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে বহুমুখী কূটনৈতিক তৎপরতা এখন সময়ের দাবি।
অস্বস্তির তালিকায় নতুন যুক্ত হয়েছে ৩০টি জেলায় হামের সংক্রমণ এবং ঢাকার কেরানীগঞ্জের মতো শিল্পাঞ্চলগুলোতে ঘনঘন অগ্নিকাণ্ড। এ ধরনের ঘটনাগুলো আমাদের নগর পরিকল্পনা ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভঙ্গুরতাকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।
২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ অনেক। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা বজায় রাখাই হবে সরকারের জন্য এসিড টেস্ট। নাগরিক সমাজ আশা করে, ক্ষমতার দড়ি টানাটানিতে সাধারণ মানুষের জীবন যেন পিষ্ট না হয়। সংস্কারের যে স্বপ্ন নিয়ে নতুন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তার সুফল প্রতিটি ঘরে পৌঁছাতে হলে কেবল আশ্বাস নয়, প্রয়োজন কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ।
একটি টেকসই ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার লড়াইয়ে আমাদের জয়ী হতেই হবে।